ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে

সপ্তাহখানেক আগে পরপর দুজন মৃত মানুষকে স্বপ্নে দেখলাম। একবার জেরিনকে, পরের শনিবার দেখলাম পৃথ্বিদা'কে। ছোটবেলায় দাদুর মৃত্যুর পরে একবার শুধু স্বপ্নে দেখেছিলাম। আমাদের নাকি চেনেন না, কিন্তু ঠিকভাবে চলাফেরা করার উপদেশ অনর্গল দিয়ে যাচ্ছিলেন।

অসুস্থ্যাবস্থায় মৃত্যুর আগে রোগীর কষ্টের চেয়েও স্বজনের ভোগান্তি অনেক বেশি। চোখের সামনে ১ম প্রাণহীন শরীর দেখি ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময়, জেঠুর লাশ। মা-বাবার পরে যে মানুষটা আমার সবচে কাছের ছিলেন সে দিদার(নানী) প্রাণবিয়োগ দেখি ক্লাস ফাইভে থাকতে। এক অসাড় শরীর। অথচ কিছুক্ষণ আগেও চোখ টলমল করে নড়ছিল। শুনেছি মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বড়মা'র(দাদুর মা) সামনে তার ৩ সন্তান ঘণ্টার আগেপরে চোখের সামনে মারা যান।

এসব দেখতে দেখতে শুনতে শুনতে অনেক আগেই শিখে যাই, মৃত্যুর মুখোমুখি যে কোন সময় হওয়া লাগতে পারে। Literally we have no "এক সেকেন্ডের ভরসা"। মৃত্যুর চেয়ে সত্য আর কিছু নেই। কিচ্ছু নেই। কিন্তু John Keats বলে গেলেন “Beauty is truth, truth beauty, ...". কী অদ্ভুত Paradox ! তার মানে মৃত্যুর মাঝেও সুন্দর কিছু আছে !? হতেও পারে! তা না হলে ভানুসিংহ হয়ত বলতেন না, "মরণ রে, তুঁহু মম শ্যামসমান।"
স্বপ্নে জেরিন বলেছিল,
-- "ভাই, ব্যাচ ট্যুরে যাই। আপনি তো যাবেন না, নেওন-ও যাইবো না।
-- যা চিল কর। ট্যুর সেরা হবে দেখিস!"
আমার স্বপ্নে কেউই আজ পর্যন্ত কষ্টে আছেন বলে বলেন নি।

পৃথ্বী দা'কে স্বপ্নে দেখাটা অদ্ভুত। এ লোকটার খামখেয়ালিপনাসহ বেশ কিছুই আমার বিরক্ত লাগতো, তবে অনেক সম্মান আর ভালোবাসতাম। উনি জানতেন সেটা। স্টুডিওতে দাদাকে বলছিলাম,
-- "আপনি বাঁইচা আছেন! আর এরকম একটা মজা নিলেন ! এটা উচিত হইসে? হুদাই ক্যান যে করেন এইসব !
-- আরেহ! দেখলাম মইরা গেলে তোরা কী করোস !
-- আমার গানটা ঠিক করে দ্যান ! আবার কখন কই চইলা যান।
-- হয়ে যাবে। এত কথা বলিস কেন !
-- হ ! হুদাই মাইনশেরে যে কষ্টটা দিসেন বুঝবেন ঠ্যালা। স্টুডিও থেকে বাইর হন একবার।"
সচরাচর এমন কাউকে কখনো দেখিনি যে বেঁচে থাকতেও হতাশায়-ব্যর্থতায় মরেনি। অথচ বাঁচা মানে ফিনিক্স পাখির মত বারবার মরার স্বাদ নিয়ে ডানা ঝাপটিয়ে উড়াল দেয়া। John Donne যেমনি চটাস করে বলে ফেললেন, "Die not, poor Death, nor yet canst thou kill me." সিদ্ধান্ত নেই, প্রত্যেকটা সেকেন্ড এমন করে উপভোগ করে বাঁচবো, যেন আজই আমার শেষদিন। সুখ-দুঃখ, বাঁচা-মরা, আনন্দ কিংবা ভোগান্তি সব ভুগবো। ঘটনাক্রমে ধারণা আরো গাঢ় হল হাসপাতালে ক'দিন মানুষের দুর্দশা দেখে।

প্রিয় কাউকে চিরদিনের জন্য বাঁচিয়ে রাখা কিংবা নিজে টিকে থাকার একমাত্র উপায় হল তাকে নিজের মধ্যে বাঁচানো। শরীরের রূপ, স্পর্শ, শব্দ, গন্ধের চাইতেও আত্মা নামক এক সূক্ষ্ম সত্তাকে ভালোবেসে অনুভবে ধারণ করা। "আত্মা" না বলে "Spirit" বললে বুঝতে আরো স্পষ্ট লাগে, দেহত্যাগে যা মুক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সাড়ে তিন হাত গণ্ডির বাইরে। অথচ কেন যেন মনে হয় মানুষের এই জৈবিক মৃত্যুর পর ২য় এবং শেষ মৃত্যুটা আমরা নিজের হাতে করি। যার Spirit বা সত্তাকে ধারণ করা উচিত তাকে আমরা নিজেরাই মেরে ফেলার বন্দোবস্ত করি নিজেদের আবেগ নামক এক মোহ দিয়ে।
তিক্ত শোনালেও সত্য, আমরা কষ্ট পাই নিজের একান্ত কিছু আবেগ-অনুভূতি ভাগাভাগির জায়গার অনুপস্থিতির জন্য, কিছু অপূরণের জন্য। আফসোসে ভুগি কিছু না বলা কথা, শেষ না করা কিছু কাজের জন্য। অন্যকে ভালোবাসিও তাই নিজের জন্য। মৃত্যুই সব না; শেষ আশ্রয় অথবা ঠিকানা। জ্যান্ত-মরা আর মৃতকে তাই আলাদা করে দেখি আমি।
কে বলবে যিনি স্বর্গত তার প্রিয়জনের পাশে তিনি বসে নেই?!

"ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে"

Comments

Popular posts from this blog

সুরের ভেলার ভেসে চলা - সঙ্গীতের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ(ভারতীয় সঙ্গীত) : শুভ কর্মকার

সে এক কিশোরের গল্প - শুভ কর্মকার

আমার-আপনার বাঙালির রবি নজরুল... - শুভ কর্মকার